হারানো সুর ২য় খন্ড (Amal)
A
0
Altın Yaprak
ও বললো-
টাকাই কি সব জীবনে? মানুষ হয়ে মানুষের জন্য কিছু করবো না? তাহলে নার্স হলাম কেন? ব্যবসায়ী বা রাজনীতিক বা চোরও তো হতে পারতাম!
আমি আর কথা বাড়াই নি। আমি জানি- তিথি দৃঢ় চেতার মানুষ। যা ও করতে চায় না, তা ওকে দিয়ে করা করানো যায় না। আর যা ও ভালোবাসে, তা ও প্রাণের বিনিময়ে করবে।
কিন্তু লাভ কি হলো? ওর এই দৃঢ় চেতনা-ই তো ওর প্রাণ কেড়ে নিলো। কাজের প্রতি নিষ্ঠাই তো ওর প্রাণ কেড়ে নিলো।
তিথি বেশ ভালোই জানতো, পৃথিবী জুড়ে করোনা ভাইরাস ভয়াবহ তান্ডব চালাচ্ছে। যদিও ভারতে এখনও, এদিক ওদিক করে গুটিকয় রুগী। তবুও তিথি হাসপাতাল কতৃপক্ষকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছিলো। ও আমাকে বলেছিলো- ভরতবর্ষের ডাক্তাররা, ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্টের উপর বেশি ফোকাস্ড, ইনফেকশান কন্ট্রোলের ব্যাপারে ভারতের ডাক্তারদের হাতে কলমে শিক্ষা আর তার প্রয়োগ তত বেশি পোক্ত নয়। কাজেই ইনফেকশান কন্ট্রোলের প্রয়োজনীয়তাটা, নার্সদেরকেই ভালো করে জানতে হবে। আর এই প্রয়োজনটা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বেশ দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিলো তিথি। তবুও...
এই তো মাত্র পাঁচ দিন আগের কথা। সকালে, পার্কে প্রাতঃভ্রমণ সেরে যখন বাড়ি ফিরলাম, তিথিকে রান্নাঘরে দেখতে পেলাম না। সাধারণত, আমি যখন প্রাতঃভ্রমণ থেকে ফিরি, তখন ও ব্রেকফাস্ট বানিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য তৈরী। কিন্তু সেদিন ওকে রান্নাঘরে দেখতে না পেয়ে সোজা আমি বেডরুমে গেলাম। বেডরুমে ঢুকলে, ও আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। বেশ দুর্বল গলায় ও বললো-
"খুব দুর্বল বোধ হচ্ছে অমল। বিছানা থেকে উঠতে পারছি না। মাথাটা বেশ ধরেছে। দেখো তো, জ্বর এসেছে কিনা।"
তাড়াতাড়ি করে ড্রয়ার থেকে থার্মোমিটার নিয়ে ওর জ্বর মাপলাম আমি। দেখলাম ১০২ ডিগ্রী।
ও বললো-
"এ কিচ্ছু না। তুমি বরং একটু চা বানাও। আমি ততক্ষনাৎ তৈরী হয়ে রান্নাঘরে আসছি।"
রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের জল চড়িয়েছি আমি, তো হটাৎ ঠক করে একটা আওয়াজ! বেডরুমে ছুটে এসে দেখি, তিথি তখন দরজা ধরে হাঁফাচ্ছে। আর সঙ্গে একটু খুকখুকে কাশি।
ওকে ধরে আবার বিছানায় শুইয়ে দিলাম আমি। বললাম-
তুমি একটু রেস্ট করো। আমি বরং ট্যাক্সি ডেকে আনছি।
তিথি কিছু বলার আগেই, রাস্তায় নেমে ছুটলাম আমি। রাস্তার মোড়ে একটা ট্যাক্সি পেয়ে, সেটাকে বাড়ির নীচে দাঁড়াতে বললাম। এরপর ঘরে ঢুকে, তিথির কিছু অতি আবশ্যক জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে, তিথিকে বললাম-
চলো, তোমায় হাসপাতালে দেখিয়ে আসি।
তারপর তিথিকে ধরে, নীচে নেমে ট্যাক্সিতে চড়লাম। বললাম-
"মেডিক্যাল কলেজ"
এমার্জেন্সি বিভাগে, অনেকেই তিথির পরিচিত। তিথিকে ওরা হাসপাতালে ভর্তি করে নিলো। ডাক্তাররা বললো ভাইরাল ফিভার। ঠিক হয়ে যাবে।
তিথির ছোট্ট কেবিনে, চেয়ার নিয়ে বসে রইলাম আমি। সারাদিনেও জ্বরটা আর কমলো না। প্যারাসেটামল খাওয়ার পর জ্বর কিছুটা কমে, কিন্তু তারপর আবার ফিরে ফিরে আসে। ওর কাশিটা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো। তবুও কিন্তু কথাবার্তা বেশ ভালোই বলতে পারতো ও।
পরদিন সকালে জ্বরটা কখনো ১০৩, কখনো ১০৪ এ উঠতে থাকলো। ডাক্তাররা বললো- করোনা ভাইরাস হওয়ার সম্ভাবনা যদিও বেশ কম, তবুও ওরা আজ, করোনা ভাইরাসের টেস্টের জন্য থ্রোট আর স্পুটাম স্যাম্পল পাঠিয়েছেন।
বিকেলের দিকে কাশির সঙ্গে সঙ্গে ওর শ্বাস কষ্ট শুরু হলো। ডিউটিতে থাকা জুনিয়র ডাক্তারকে ব্যাপারটা আমি জানালাম। উনি ফোনে সিনিয়র ডাক্তারের সাথে তখুনি কথা বললেন। সন্ধ্যার দিকে ওরা তিথিকে 'আই সি ইউ'তে ভর্তি করে নিলো।
এই সেই 'আই সি ইউ', তিথি যার ইন চার্জ। ভাগ্যের কি পরিহাস! তিথি যেখানে মানুষের সেবা করে, আজ তিথিই সেখানে সেবা প্রার্থী। নার্স হলেও, সেও তো মানুষ। সেও তো পৃথিবীর আরও ৮০০ কোটি মানুষের মতো সমান ভঙ্গুর। তারও রোগ আছে। তারও চিকিৎসা দরকার।
'আই সি ইউ'তে ভর্তি হলেও, তখনও তিথি ভালোই শ্বাস নিচ্ছে। নাকে যদিও ওর, অক্সিজেনের নল লাগানো। কিন্তু মধ্যরাতে হঠাৎই ওর শ্বাস কষ্টটা বেড়ে গেলো। ডিউটিরত ডাক্তার আমায় জানালেন, তিথি অক্সেজেনে থাকলেও, ওর অক্সিজেন স্যাচুরেশন মাঝে মাঝে বেশ ড্রপ করছে। তাই ওকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হবে।
কিছুক্ষণ পর তিথিকে ওরা ভেন্টিলেটরে চড়িয়ে দিলেন।
আই সি ইউ এর বাইরে, দরজার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে; এক নার্স আমাকে 'আই সি ইউ'র দরজার সামনে থেকে, তিথিকে দেখার সুযোগ করে দিলেন। আমি দূরে থেকে তিথির মুখের দিকে তাকালাম। বুকটা ধক করে উঠলো। হায় ঈশ্বর! এই দুদিনেই ওর চোখ দুটো ভেতরে ঢুকে গেছে। কালো ঊজ্জ্বল চোখের সেই আলো আর নেই। মুখের চামড়া বিবর্ণ। ঠোঁট শুখনো ফ্যাকাশে।
তিথি। আমার তিথি! চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়লো আমার। ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না আমি। 'আই সি ইউ' ছেড়ে, হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে বসে রইলাম আমি।
মেঝেতে বসে, গুনছি আমি প্রতিটা প্রহর। প্রতিটা মুহূর্ত। মাপছি আমি, আমার ভাগ্যের দৈর্ঘ প্রস্থ উচ্চতা। অপেক্ষা করছি, কখন তিথি একটু সুস্থ হবে। আমি মনে মনে নিশ্চিৎ- তিথি সুস্থ হবেই। সুস্থ ওকে হতেই হবে।
চতুর্থ দিন দুপুরে, ডিউটিরত ডাক্তার আমাকে খবর দিলেন- তিথির করোনা ভাইরাস টেস্ট পজিটিভ এসেছে। উনি বললেন- কোয়ারেন্টিনের জন্য সমস্ত স্টাফকে ছুটি দেওয়া হচ্ছে। কোন নতুন রুগী এই 'আই সি ইউ'তে আর ভর্তি করা হচ্ছে না। এখানকার অন্যান্য রুগীর জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
কিছুক্ষণ থেমে উনি বললেন- আমার আর হাসপাতালে থাকা চলবে না। আমাকেও এখন, আমার নিজের বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। উনি বললেন- আমারও স্যাম্পল ওনারা, করোনা ভাইরাস টেস্টের জন্য পাঠাবেন। উনি জানালেন- এ হলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উপদেশ।
কোন উপায় না দেখে, আমি 'আই সি ইউ'র দরজার সামনে থেকে তিথিকে দেখতে চাইলাম। ডাক্তারবাবু আমাকে বললেন- আমি তা করলে উনি বিপদে পড়বেন।
তিথিকে একটু না দেখেই চলে যাবো? মনের মধ্যে এই একটা প্রশ্ন বারবার আঘাত করতে লাগলো। হায় ঈশ্বর! আমার তিথিকে একটু না দেখেই চলে যাবো? চাপা এক আর্তনাদ থেকে থেকে জেগে উঠলো। 'আই সি ইউ'র বন্ধ দরজার দিকে অপলকে চেয়ে রইলাম আমি। "তিথি। আমার তিথি, তোমাকে একটু না দেখেই চলে যাবো? " চোখের জল প্লাবন হয়ে গড়িয়ে পড়লো। বুকের মধ্যে এক শূন্যতা, হাহাকার করে উঠলো। আত্মা আর্তনাদ করে উঠলো। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগলো। হাত পা দূর্বল বোধ হলো। কোনক্রমে দেওয়ালটা ধরে, বসে পড়লাম আমি।
হুঁশ যখন ফিরলো, বুঝলাম- কোন উপায় নেই আমার। ফিরে আমাকে যেতেই হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এমার্জেন্সি বিভাগে, থ্রোট আর স্পুটাম স্যাম্পল দিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম আমি।
ঋতু রাতে ফোন করে জানালো, লন্ডনে নিষেধাজ্ঞার জন্য, কলকাতা আসার ফ্লাইট ও এখনো বুক করতে পারে নি। ও চেষ্টা করছে, হয়তো আগামী কাল রওনা দিতে পারবে। ও জিজ্ঞেস করলো-
"মা কেমন আছে বাবা? "
জানি না। 'আই সি ইউ'এ আছে। আসার সময় আমাকে ঢুকতে দেয় নি ওরা?
'আই সি ইউ'-এ? " ঋতুর গলায় ভেজা কান্না।
আমি আর পারলাম না। বললাম-
তুই ঘাবড়াস না মা। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই সাবধানে আসিস।
এই বলে ফোনটা রেখে দিলাম আমি।
ফোনটা রেখে দেওয়ার সাথে সাথে, চোখে- জলের স্রোত নেমে এলো আমার। মনের মধ্যে এক ভয় মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো- সত্যিই কি সেরে উঠবে তিথি? হে ঈশ্বর তুমি আমাকে মৃত্যু দাও। কিন্তু তিথিকে নয়।
রাতে ঘুম হলো না আমার। ভেসে উঠলো, আমাদের পুরানো দিনের স্মৃতি- মাকে সঙ্গে নিয়ে তিথিকে দেখতে যাওয়া। লাজুক চোখে তিথির, আমার দিকে তাকিয়ে থাকা। আমাদের বিয়ে। দার্জিলিং বেড়াতে যাওয়া। ঋতুর জন্ম। ঋতুকে কোলে নিয়ে তিথির সোনালী হাসি। তিথি......
ভোর সকালে ফোন বেজে উঠলে তড়িঘড়ি জেগেউঠলাম আমি। ফোনটা নিয়ে বললাম-
হ্যালো....
"অমল বাবু, 'আই সি ইউ' থেকে ডাক্তার মাইতি বলছি আমি।"
আমি চুপ করে রইলাম।
"আমি দুঃখিত। ভোর রাত থেকে তিথি দেবীর হৃৎস্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে না।"
মানে?
"উনি আর এ জগতে নেই। "
ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেলো আমার। মাথা চেপে ধরে কেঁদে উঠলাম আমি-
তিথি তুমি কোথায়? কেন বাঁচবো হে ঈশ্বর? কি জন্য বাঁচবো? তিথি ছাড়া...
© Arun Maji
Bu şiiri puanla
Henüz puan verilmemiş