অমল-তৃষ্ণার গল্প অবলম্বনে। অরুণ মাজীর উপন্যাস থেকে। (Trishna)

A Arun Maji Arun Maji
0 Altın Yaprak
পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে বাথরুমে গেলাম। চোখে মুখে একটু জল দিয়ে, নীচে নামার সিঁড়িতে বসলাম। লম্বা শ্বাস নিয়ে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ছাড়লাম। যাক বাঁচা গেছে! পরীক্ষা শেষ। সব পরীক্ষা শেষ। একটু আত্মসমীক্ষা করতে ইচ্ছে করলো। নাহঃ পরীক্ষা মোটেই খারাপ হয়নি। চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখিনি আমি। তৃষ্ণার চিন্তা মনঃসংযোগ একটু কেড়েছে বটে, কিন্তু তা আমাকে জেদীও করেছে। ভালোরই বরং পাল্লা ভারী। মানুষের চোখের সামনে একটা নক্ষত্র থাকতে হয়। যে নক্ষত্র তাকে আকাশ ছুঁতে হাতছানি দেবে। ভালোবাসা উৎসাহ আর প্রেরণাকে যদি, মানুষের জীবন থেকে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে রক্ত মাংস ছাড়া, মানুষের আর রইলো কি? ভালোবাসা উৎসাহ প্রেরণা ছাড়া, এক বছরও কি বাঁচতে পারে মানুষ? মানুষের বাঁচার রসদ আসে কোথা থেকে? মানুষ বাঁচতে চায় কেন? ফুলের জন্য? নদীর জন্য? মায়ের ভালোবাসার জন্য? প্রেমিকার কোলে মাথা রেখে আকাশ দেখার জন্য? হয়তো বা প্রেম আর প্রকৃতির জন্য। প্রেম প্রকৃতি কথা দুটো এক? অথবা আলাদা? প্রকৃতি কি দিয়ে তৈরী? সৌন্দর্য্য আর ভালোবাসা দিয়ে। কেন? প্রকৃতির সব কিছুই সুন্দর। প্রকৃতির ভালোবাসার জন্যই মানুষ বেঁচে, পশু বেঁচে। সৌন্দর্য্য আর ভালোবাসা কথা দুটো এক অথবা আলাদা? সৌন্দর্য্যের গর্ভে ভালোবাসার জন্ম। ভালোবাসার গর্ভে সৌন্দর্য্যের জন্ম। তাহলে এরা এক নয় কি? ধুস! কি সব ভাবছি আবার! আমি অমল বোস। শান্ত হয়ে একটু বসলেই, মহাবিশ্ব প্রশ্নের ডালি নিয়ে আমার কাছে হাজির হয়। দীর্ঘ পরীক্ষার প্রস্তুতি, দীর্ঘ দিনের পরীক্ষার ধকল, এমনকি আজকের দুটো পরীক্ষার ধকল- এ সব কিছু অমল বোসের দেহকে ক্লান্ত করতে পারে, কিন্তু তার চিন্তা করার ক্ষমতাকে ক্লান্ত করতে পারে না। চিন্তার গর্ভে জন্ম অমল বোসের। হয়তো চিন্তার গর্ভেই মৃত্যু হবে অমল বোসের। প্রত্যাশার চাপ অনেক। কিন্তু আমি বড় ভাগ্যবান, তাই আমার জীবনে অনেক দুর্ভাগ্য ঘটেছে। সেই সব দুর্ভাগ্য, শিশু বয়সেই আমাকে চাপ মুক্ত হওয়ার উপায় শিখিয়েছে। সকালে ​আজ ​মাকে প্রণাম করে বলেছি- মা, আমি কিন্তু পরীক্ষা শেষ হলেই কলকাতা যাবো। মা হেসে বলেছে- "আগে পরীক্ষাটা তো ভালো করে দে। তারপর না হয়, ওসব ভাবিস।" তারপর বলেছে- "আমি মজা করলাম অমল। আমি জানি, তুই যা কিছু করিস, তা সর্বান্তঃকরণে করিস। চৈতি আর তৃষ্ণাকে বলিস, এখানে আসতে।" এই আমার মা। গতকাল রাতে, মা নিজেই আমার কলকাতা যাওয়ার জন্য, আমার ব্যাগ গুছিয়ে দিয়েছে। আমি যে কোনদিন ভুল করতে পারি, মা তা কোনদিন মনেও আনে না। এতে আমি গর্বিত, কিন্তু মায়ের এই বিশ্বাস আমাকে আরও দায়িত্বশীল হতে ​শিখিয়েছে। ​মরে গেলেও আমি কখনো ​মাকে আঘাত ​করতে পারবো না। ​ মাকে ভাবলেই ​পাহাড় পর্বত সাগর আকাশ মনে ​পড়ে আমার। আকাশ সমান ভালোবাসা সাগর সমান গভীরতা পর্বত সমান সহন। স্রষ্টা মানুষকে বড় ভালোবাসে​ন। ​​ তাই তিনি- ​ পাহাড় পর্বত সাগর আকাশ একত্র করে মা রূপে মানুষকে দিয়েছেন। ​নাহঃ। দেরী ​হচ্ছে।সাড়ে চারটা ​বেজে গেলো। তৃষ্ণার বাড়ি​তে পৌঁছতে পৌঁছতে, রাত প্রায় নটা বেজে যাবে​! এখনই উঠা দরকার। বাস স্টপ থেকে বাস ধরে, স্টেশনে এলাম। স্টেশনে তত ভিড় নেই। স্টেশনে আসার সাথে সাথেই ট্রেন পেয়ে গেলাম। ফাঁকা কামরা। আমি ছাড়া আর জন কয়েক​জন যাত্রী মাত্র। ট্রেনের জানালা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে। সোয়েটার​টা চড়িয়ে নিলাম। জানালাগুলো বন্ধ করতে ইচ্ছে করলো, কিন্তু দেখলাম সূর্যটা ​বড় সুন্দর এখন। ​দিগন্তে রাঙা হয়ে ডুবে যাচ্ছে। চলন্ত ট্রেন থেকে রাঙা আলোতে, দূরের ধান জমি, বাড়িঘর, ক্ষেত-বাগান​, ​ সবই বড় সুন্দর লাগছে। শেষ কয়েক সপ্তাহ, প্রকৃতিকে ভালো করে দেখার সুযোগ হয় নি। পরীক্ষা ​বড় নিষ্ঠুর। মানুষকে ​ভয় দেখিয়ে আচ্ছন্ন করে রাখে। ​​কিন্তু মানুষের দুর্ভাগ্য, স্কুল পরীক্ষার ফল জীবনকে বোধহয় একটুও সহজ করে না। জীবন কেবল জীবনের মতো। জীবন ভূগোলের মানচিত্র নয়। ইতিহাসের পিরামিড নয়। অঙ্কের পাটিগণিত নয়। ​মনটা একটু খারাপ। ​রাজা দেবু বাবলু অনামিকা- এদের সাথে কথা হলো না। ​এদের ​পরীক্ষার সিট অন্য কলেজে। ​আমি ​প্রার্থনা করি- ওদেরও পরীক্ষা ​যেন ​ভালো হয়। বাড়ি ফিরে ওদের সাথে খুব হৈ চৈ করবো । ঊহঃকি মজা! ​শেষ। পরীক্ষার যন্ত্রনা শেষ। হটাৎ খেয়াল হলো​, ​ সন্ধ্যে হয়ে ​গেছে। ঠান্ডার তীব্রতা বাড়ছে। জানালাটা বন্ধ করে দিলাম। "চা চায় বাবু, চা। বাবু চা খাবেন? " চাওয়ালা ছেলেটি, আমার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে। বয়স আট কি দশ। মুখে হাসি, আর চোখে অদম্য উচ্ছ্বাসের ছাপ। আমি হেসে বললাম- দে ভাই, এক কাপ চা দে। ​একটা বিস্কুটও দে। খিদে পাচ্ছে​ বেশ। ক্লান্তিও লাগছে। চা ঢালতে ঢালতে​ ছেলেটা বললো- "বাবু গরম গরম চা।" আমি জিজ্ঞেস করলাম- কে বানিয়েছে এই চা? ছে-"মা। " আ-তুই চা বানাতে পারিস না? ছে-"পারি। কিন্তু আমার মা-ই ভালো চা বানায়।" আ-বাড়িতে ​তোর ​আর কে আছেন? ছে-"মা, দুটো ভাই​, ​ আর এক বোন। " আ-তোর বাবা? ছে-"বাপ তো কবেই মরে গেছে। মদ খেয়ে খেয়ে, লিভার ফেল হয়ে মরে গেছে। " আ-তোদের চলে কি ভাবে? ছে-"মা বাবুদের বাড়িতে রান্নার কাজ করে। আর আমি চা বেচি। " আ-স্কুলে ​যাসনা তুই? ​ ছে-"দু ক্লাস পড়েই ছেড়ে দিয়েছি। বাবু টাকাটা ​ফেরত ​নাও। " আ-তুই ওটা রেখে দে। ​শোন, ​তোর স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না? ছে-"ইচ্ছে তো করে। কিন্তু স্কুলে গেলে, সংসার চলবে ​কি করে? " আ-দিনে কতোটাকা রোজগার করিস তুই? ছে-"কোন দিন পঞ্চাশ টাকা, কোনদিন সত্তর টাকা।" আ-কতক্ষন কাজ করিস তুই? ছে-"সকাল আটটার সময় বেরোই। আর ঘরে ফিরি রাত ন-টার সময়।" আ-তোর মা চিন্তা করে না? ছে-"করে। কিন্তু মাকে আমি বলি​-​ আমি বড় হয়ে গেছি মা। তোমার কোন চিন্তা নেই। " আ-আর তোর মা কি বলে? ছে-"মায়ের চোখটা জলে ভরে যায়।​ভগবানকে ডেকে ​বলে- ​​"মা দুগ্গা, রাজুকে ভালো রেখো মা।" আ-তোর নাম রাজু? ছে-"হ্যাঁ। " আ-তুই বড় হলে কি হতে চাস, রাজু? ছে-"আমি নবগ্রাম স্টেশনে, বড় একটা চায়ের দোকান করতে চাই। বাবু, সামনে স্টেশন আসছে, আমি নেমে যাবো।আমাকে নবগ্রাম​​ফিরবো। " আ-তুই ভালো থাকিস রাজু। রাজু চায়ের কেটলি ​আর ​ভাঁড়ের ব্যাগ নিয়ে নেমে গেলো। ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করলো। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ভাবলাম- আমিও তো রাজু হয়ে ​জন্ম নিতে পারতাম। সকাল আটটা থেকে রাত নটা পর্যন্ত ট্রেনের কামরায়-"চা চায় বাবু, চা চায়" বলে চীৎকার করতাম। কোন ​সৌ​ভাগ্য বলে​, ​ কেউ অমল হয়ে জন্মায়, আর কেউ রাজু হয়ে জন্মায়? মানুষ কেবল আকাশে​র রামধনু ​দেখে। মানুষ কেবল আকাশকে হিংসে ​করে। মাটির নীচে কেঁচোর সংগ্রাম​ আর তার ​যন্ত্রণা, সে কখনো ভাবতেও চায় না। মানুষ কি কখনো ভাবে, মানুষকে কেঁচো হয়ে যন্ত্রণাময় জীবন কাটাতে হয় না কেন? মানুষ​ যতদিন নীচে তাকানোর অভ্যাস না ​করছে, মানুষ ততদিন তার নিজের তৈরী যন্ত্রণার আগুনে, ঝলসে ঝলসে মরবে। ট্রেনটা হাওড়ার কাছাকাছি এসেছে। কামরার মধ্যে লোকজন বাড়ছে। সকলের মুখে এক ক্লান্তির ছাপ। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি শেষে​ সকলেই ​ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ​ফিরছে। রাতটা শুধু নিজের বাড়িতে ​কাটানো। আর তারপর আবার একটা দিন। এই কি জীবন? এই জীবনের ​জন্যই, মানুষের এতো মায়া​? ​ এতো সংগ্রাম? ​নাহঃ তা হতে পারে না। ​হয়তো জীবনে আরও কিছু ​একটা ​আছে। ​কিন্তু ​সেটা কি? ট্রেনটা থেমে গেলো। হাওড়া এসে গেছি। হটাৎ সম্বিৎ ফিরে পেলাম, আমি এখন ​"​আমার তৃষ্ণার​"​ কাছে যাচ্ছি। সারাদিন পরীক্ষার ধকল​ শেষে​, বাস​-ট্রেন ​চড়ে ক্লান্ত হয়ে, আমি এখন তৃষ্ণার কাছে যাচ্ছি। এতো ক্লান্ত​ আমি। ​তবুও মুখে ​আমার ​এক চিলতে হাসি। ​এখন বুঝলাম- ​​কেন মানুষ সারাদি​নের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি শেষে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরতে চায়! ওদের প্রত্যেকের বাড়িতেই হয়তো​, ​ ​আমার মতো ​এক তৃষ্ণা আছে, বা রাজুর মতো মমতাময়ী ​এক ​মা আছে। ​(অমলের জীবন নিয়ে বেশ কতকগুলো উপন্যাস লিখলাম। জীবনের এক এক পর্বের জন্য এক এক উপন্যাস। এগুলো উপন্যাস নয়, মানুষের হৃদয়ের স্পন্দনগুলোকে কাগজের পাতায় এক সাথে জড়ো করা। এখানে জীবন আছে, যন্ত্রণা আছে, স্বপ্ন আছে, স্বপ্ন ভঙ্গের ব্যথা আছে, ভালোবাসা আছে, ভালোবাসার দহনও আছে। পাবলিশ কবে করবো জানি না, কারন পাবলিশিং হাউস খোলার জন্য সময় পাচ্ছি না।) © অরুণ মাজী Arun Maji Painting: John William Godward

Bu şiire çeviri ekle ·

Bu şiiri puanla

Henüz puan verilmemiş

Yıldıza dokunarak 1–10 arası puan ver

Yorumlar

Yorum yapmak için giriş yapmalısın.

Giriş yap

Bu şiire henüz yorum yapılmamış. İlk sen ol.

Sana daha iyi bir okuma deneyimi sunabilmek için sitemizde çerez kullanıyoruz. Kişisel verilerin KVKK ve GDPR kapsamında işlenir; hangi çerezlere izin verdiğini dilediğin zaman değiştirebilirsin.