চড়াই উৎরাই ১৮ (Trishna)
A
0
Altın Yaprak
কার্গিল যুদ্ধের পটভূমিতে অরুণ মাজীর উপন্যাস
চড়াই উৎরাই ১৮
তৃষ্ণাকে ক্যাপ্টেন অমল বোসের চিঠি
-------------
জানো তৃষ্ণা?
সবাই ভঙ্গুর। কেউ অল্প আঘাতে ভাঙে। কেউ একটু বেশি আঘাতে ভাঙে। কিন্তু ভঙ্গুর সবাই।
স্থিতধীরাও ধৈর্য হারায়। পন্ডিতরাও ভুল করে। স্বাস্থ্যবানরাও রোগে ভুগে। সংযমীরাও সংযম হারায়।
চারিদিকে হিংসা দাঙ্গা মৃত্যু দেখতে দেখতে, কেমন যেন ক্লান্ত আমি। অবসন্ন আমি। প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ ছেলে আমি। খেয়ে পরে বেঁচে থাকবো, এই যথেষ্ট আমার। তুমি তো জানো, কত সাধারণ জীবন যাপন আমার। এই হিংসা দাঙ্গা হত্যার মধ্যে, তাই মন টিকে না আমার।
কেউ আমার শত্রু নয়। আমিও কারও শত্রু নই। অথচ তুমি ভাবো, সীমান্তের এপারে আমরা। ওপারে ওরা। আমরা কেউ কাউকে কখনো দেখি নি। কেউ কাউকে চিনিও না। পরস্পরকে যদি চিনি না, তো আমরা পরস্পরের শত্রু হলাম কবে?
দেশের নেতারা, নিরীহ মানুষকে শেখাচ্ছে, অন্য দেশের মানুষরা তাদের শত্রু। দেশের নেতারা, ক্ষমতা আর সম্পদ দখলের জন্য, মানুষের মনের মধ্যে ঘৃণার বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। অথচ তুমি দেখো, এই যুদ্ধে মরছে কারা? পাকিস্তান বা ভারত, কোন দেশেরই নেতারা মরছে না। মরছে, দুই দেশের গরীব দুর্বল সিপাই। আর সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ।
জানো? ধীরে ধীরে, আমিও যেন দুর্বল হয়ে পড়ছি। দেখতে দেখতে প্রায় তিন বছর হয়ে গেলো, এখানে রয়েছি আমি। এখন, এখান থেকে চলে যাওয়ার কথা আমার। কিন্তু পোস্টিং আসছে না। জানি না কবে পোস্টিং অর্ডার পাবো। আমার সঙ্গে যে সমস্ত ডাক্তার এখানে এসেছিলেন, তাদের অনেকেই এখান থেকে চলে গেছেন। অথচ দুর্ভাগ্য আমার, পোস্টিংয়ের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও, এখানে রয়েছি আমি।
জানো? তাদেরকে চলে যেতে দেখে, আরও বেশি কষ্ট হয় আমার। আরও বেশি কষ্ট হয়, তোমাকে দেখি নি বলে। মাকে দেখি নি বলে। ঠাম্মাকে দেখি নি বলে।
ইউনিটের লোকজন আমাকে ভালোবাসে। তাদের ভালোবাসায় কষ্ট একটু ভুলি। কিন্তু তা কেবল ক্ষণিকের জন্য। আসলে, মৃত্যু আমি দেখতে পারি না। একজন মানুষ হয়ে, অন্য এক মানুষকে কি মরতে দেখতে পারি? পারি না। তো তুমিই বলো, এদের ভালোবাসা কি, আমার এই মর্মবেদনা লাঘব করতে পারবে? নাঃ কখনো পারবে না।
যাক গে, আমার কথা অনেক হলো। এবার তোমার কথা বলো। তোমার পিএইচডি কত দূর এগোলো? পিএইচডি শেষ করে তাড়াতড়ি ফিরে এসো তুমি। আমিও চেষ্টা করছি, কলকাতাতে পোস্টিং নেওয়ার জন্য।
তুমিই ঠিক করেছো। পড়াশুনার মধ্যে আছো। তো হিংসা দাঙ্গা মৃত্যু থেকে, দূরে আছো তুমি। জানো? এই ভালো আমাদের। তোমার পড়াশুনা আর আমার রুগী দেখা- এই ভালো আমাদের। এই হিংসা দাঙ্গা যুদ্ধ আমাদের জন্য নয়।
যুদ্ধ যারা করতে চায়, তারা করুক। পৃথিবীর বুকে বিষ মিশিয়ে, যারা ক্ষমতা আর সম্পদ দখল করতে চায়; তারা করুক। আমরা দূরে সরে যাবো। এসব হিংসা দাঙ্গা মৃত্যু থেকে দূরে সরে যাবো আমরা।
হয়তো তুমি ভাবছো, পালিয়ে যাচ্ছি আমি। কিন্তু কথাটা কি জানো? তুমি যদি ভালোবাসা প্রচার করো, একজনও সাথী পাবে না তুমি। কিন্তু তুমি যদি ধর্ম জাতি ভিত্তিক ঘৃণা ছড়াও, তো কোটি কোটি অনুরাগী পাবে তুমি। তো মানুষ আমাকে না চাইলে, মানুষের সঙ্গে কেমন করে থাকবো আমি? কেমন করে থাকবে তুমি?
এক কাজ করো, পারলে ছোট্ট একটা ছুটি নিয়ে কলকাতা ঘুরে যাও। আমাকে না দেখার যন্ত্রণা, মা তোমাকে দেখে ভুলে যাবে। কাকু কাকীমাও খুব খুশি হবেন। এদিকে আমিও চেষ্টা করছি, কলকাতা যদি ফিরতে পারি।
আজ আর কবিতা লিখলাম না তোমার জন্য। যে সব কথা লিখেছি, সে সব কথার সাথে কোন কবিতা মানায় না। কবিতা পরের চিঠিতে লিখবো।
তুমি ভালো থেকো।
ইতি
তোমার অমল।
Bu şiiri puanla
Henüz puan verilmemiş