উত্তরণের পথে ৪৪ (Trishna Amal)

A Arun Maji Arun Maji
0 Altın Yaprak
বাসুবাবু বলেন- কেউ কেউ নাকি, অর্জুনের মতো সব্যসাচী হয়। তারা যা করে, তারা তা উত্তম রূপে করে। তারা নাচ করে। গান করে। যুদ্ধ করে। আবার ত্যাগও করে। ঠিক সব্যসাচী অর্জুনের মতো। মুখে যখন দুমুঠো খাবার তুলেছি আমি, তৃষ্ণা আমার দিকে চেয়ে হাসলো। জিজ্ঞেস করলো- 'রান্না কেমন হয়েছে অমল? ' মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে শব্দটা বেরিয়ে এলো- 'সব্যসাচী' কাকীমা বললেন- 'That's a big compliment, Trishna.' তৃষ্ণা লজ্জা পেলো। দুষ্টু হাসি হেসে বললো- 'কান মুলা খাওয়ার ভয়ে, অমল ভুল বকছে মা। ' কাকীমা 'ঊহঃ তোকে নিয়ে আর পারি না। সদাই অমলের কান মুলছিস তুই।' দিদি তৃষ্ণার দিকে চেয়ে বললো- 'না তৃষ্ণা, রান্না তোর সত্যিই ভালো হয়েছে। ' তৃষ্ণা 'সে কি! তুমিই তো শেখালে আমাকে।' দিদি 'আমি কেবল সাহায্য করেছি তোকে। রান্নাটা তুইই করেছিস।' অতি একাগ্র চিত্তে যখন অন্ন ধ্বংসে ব্যস্ত আমি, তৃষ্ণা আমার দিকে চেয়ে রইলো। ওর চোখে তৃপ্তির হাসি। দুষ্টু চিন্তা মাথায় এলো আমার। ভাবলাম, কারও অন্ন ধ্বংসে তৃপ্তি। কারও বা, অন্ন ধ্বংস করিয়ে তৃপ্তি। আমি প্রথমটা ভালোবাসি। মা কাকীমা দিদি তৃষ্ণা- এরা দ্বিতীয়টা ভালোবাসে। মহাবিশ্বে, দেওয়ার লোক থাকলেই চলবে না। নেওয়ার লোকও থাকতে হবে। নেওয়ার লোক না থাকলে, দাতার আনন্দ হয় না। ভালো গান গাইলেই হবে না। আগ্রহী শ্রোতাও থাকতে হবে। শ্রোতা না থাকলে, গায়কের আনন্দ হয় না। ভালো করে সে গাইতেও পারে না। ভালো রাঁধুনি হলেই চলবে না। আহাঃ আহাঃ করে তাল ঢুকবে, এমন খাদ্য রসিকও থাকতে হবে। নইলে, রাঁধুনি রান্নার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। খাওয়া শেষে কেমন যেন অলস অনুভব করলাম আমরা। তো সবাই পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। কেউ সোফায়। কেউ মেঝেতে মাদুর পেতে। কাকীমা বললেন- 'ভি সি আর- এ মুভি দেখবো আমরা। কমল-লতা সিনেমা দেখেছিস তোরা? ' দিদি 'সিনেমাটা দেখি নি। কিন্তু গল্পটা পড়েছি কাকীমা।' শরৎ চাটুজ্জ্যের কাহিনী। উত্তম-সুচিত্রার অভিনয়। হরিসাধন দাসগুপ্তের পরিচালনা। সকলের-ই বড় উৎসাহ। গভীর আগ্রহে সিনেমা দেখলাম আমরা। যেমন কাহিনী, তেমন তার পরিচালনা। সঙ্গে সুচিত্রা সেনের দুরন্ত অভিনয়। বুকে বড় বাজে গো, বুকে বড় বাজে। গহর মিঞার অকাল বিয়োগ। কমললতার শাস্তি পাওয়া। কমললতার আখড়া ত্যাগ- সবই বুকে বড় বাজে। বেদনা অনুভব করলাম আমি। মন্তব্য করলাম- ঊহঃ জাত পাত ধর্মের কি সাংঘাতিক ভণ্ডামি! এক মানুষ, আরেক মানুষকে খামোকা যন্ত্রনা দেয়। মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়! তৃষ্ণা উত্তেজিত হয়ে উঠলো। বললো- 'এই সব নিষ্ঠুর মানুষদেরকে ফাঁসি কাঠে ঝুলিয়ে দেওয়া উচিৎ।' কাকীমা 'কে শাস্তি দেবে? এরাই তো ক্ষমতাশালী। এরাই তো দেশ চালায়।' তৃষ্ণা এবার আরও উত্তেজিত হয়ে উঠলো। বললো- 'এই নিষ্ঠুরতার বলি সর্ব্বদা মেয়েরা হবে কেন? কতদিন আর এমনি করে চলবে? ' কাকীমা শান্ত স্বরে বললেন- 'কেন? গহর মিঞা তো পুরুষ, সেও তো শাস্তি পেলো।' হতাশার সুরে আমি মন্তব্য করলাম- যারা ভালো কিছু করলো, তারাই শাস্তি পেলো। তো মানুষ ভালো কিছু করবে কেন? কিসের জন্য মানুষ তাহলে ভালো হতে চাইবে? তৃষ্ণা 'আমারও একই প্রশ্ন, মা। ভালোরা যদি শাস্তি পায়, তো মানুষ ভালো হতে চাইবে কেন? ' তৃষ্ণা আহত, উত্তেজিত, বিমর্ষ। আমিও তাই। শরৎ চাটুজ্জ্যের লেখা অনেক পড়েছি আমি। ওনার সব লেখাই বাস্তবের নির্মম প্রতিচ্ছবি! ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থা যে কি, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন উনি। সে সব কাহিনী পড়লে, বুকে ব্যথা হয়। চোখ জলে ভরে যায়। ভারতীয় পরিচয় দিতে লজ্জা হয় তখন। হিন্দু পরিচয় দিতে লজ্জা হয় তখন। কষ্ট হলো আমার। মাদুরের উপর শুয়ে, সিলিংয়ের দিকে চেয়ে রইলাম আমি। দিদি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে, নীরব নিঃশব্দ। হতাশায়, তৃষ্ণা ওর মায়ের পাশে গা এলিয়ে দিলো। কাকীমা বোধহয় এই দুই তরুণ হৃদয়ের ব্যথা অনুভব করলেন। জানালার মধ্য দিয়ে উনি বাইরে দিকে চেয়ে রইলেন। বললেন- 'পৃথিবীর মধ্যে অন্যায় অবিচার অরাজকতা সদাই চলবে। দাঙ্গা হত্যা ধ্বংস সদাই চলবে। এসব দেখে, হতাশ হলে নিজের ক্ষতি করবি তোরা। পৃথিবীর ক্ষতি করবি তোরা।' তৃষ্ণা 'কেন? ' কাকীমা 'মহাবিশ্বের মধ্যেও অসংখ্য দাঙ্গা হত্যা ধ্বংস ঘটছে। প্রতিমূর্হুর্তে ঘটছে। বড় গ্যালাক্সির ব্ল্যাকহোল, ছোট গ্যালাক্সিকে আস্ত খেয়ে নিচ্ছে। বড় এক নক্ষত্র, ছোট এক নক্ষত্রকে খেয়ে নিচ্ছে। অসংখ্য নক্ষত্র জন্ম নিচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে। এই জন্ম মৃত্যু- ভয়ঙ্কর তান্ডবের সাথে ঘটছে।' তৃষ্ণা 'এর অর্থ? ' কাকীমা 'যে অশান্তি অরাজকতা, তোর নিজের দেহ মনের মধ্যে ঘটছে, সেই একই রকম অশান্তি তোর পরিবারের মধ্যে ঘটছে। তোর দেশের মধ্যে ঘটছে। পৃথিবীর মধ্যে ঘটছে। মহাবিশ্বের মধ্যে ঘটছে। তোর দেহ-মন-আত্মা, এই মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র এক সংস্করণ। আঁধারের অস্তিত্ব না থাকলে আলো ফুটবে না। ধ্বংস না থাকলে, সৃষ্টি ঘটবে না। অশান্তি না থাকলে, শান্তির মহত্ব মানুষ বুঝবে না। এসব সৃষ্টির দৈত্ব রূপ। ধ্বংস বুকে করেই, তোকে সৃষ্টির স্বপ্ন দেখতে হবে। ধ্বংসের অস্তিত্ব তোকে হতাশ করার জন্য নয়; সৃষ্টি করতে তোকে প্রেরণা দেওয়ার জন্য।' কাকীমার কোলের কাছে শুয়ে রয়েছে তৃষ্ণা। কথাগুলো শেষ করে, তৃষ্ণার চুলে হাত বুলিয়ে দিলো কাকীমা। আদর পেয়ে, মাকে জড়িয়ে ধরলো তৃষ্ণা। কাকীমা বললেন- 'তোকে স্থিতধী প্রশান্ত হতে হবে। অশান্তির মাঝে প্রশান্তি খুঁজতে হবে। আঁধারের মাঝে প্রদীপ জ্বালতে হবে। প্রশান্তিই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।' তৃষ্ণা বললো- 'এও কি সম্ভব? এইসব অরাজকতা দেখলে ক্রোধ হবে না? হতাশা আসবে না? ' আবার হাসলেন কাকীমা। শান্তস্বরে বললেন- 'ব্যাপারটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। তুই ভালো কিছুর স্রষ্টা হবি, অথচ কঠিন কিছু করবি না; তা কি হয়? যা কিছু ভালো, তা কঠিন হবেই। তৃষ্ণা 'এসব বলা সহজ। কিন্তু করা খুব কঠিন, মা।' তৃষ্ণাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন কাকীমা। উৎসাহের সুরে বললেন- 'তবুও তোদেরকে তাই করতে হবে। কঠিন বললে ছেড়ে দেবো না।' তৃষ্ণা 'তুমি বড় ভয়ঙ্কর মা! জীবনে একটু ফূর্তি করবো না? হুল্লোড় করবো না? ' তৃষ্ণার কথা শুনে, দিদি হেসে উঠলো। তৃষ্ণার দিকে চেয়ে বললো- 'ফূর্তি যদি করতে চাস, তো বৈষ্ণবীদের আখড়ায় যোগ দে। দুহাত তুলে গৌরাঙ্গ হয়ে নাচতে পারবি।' তৃষ্ণা 'তোমার আইডিয়াটা ব্যাপক দিদি। বৈষ্ণবী হওয়াই ভালো। কেবল দুহাত তুলে নাচ।' তৃষ্ণা এবার আমার দিকে তাকালো। আমাকে উদ্দেশ্যে করে বললো- 'কিরে, বৈষ্ণব হবি? ' হাসলাম আমি। বললাম- নাহঃ বৈষ্ণব হওয়ার কোন ইচ্ছে নেই আমার। তৃষ্ণা 'বেশ, তোদের কাউকে হতে হবে না। আমি একাই হবো। ' আমি- সেই ভালো। তুই যদি চাস তো, আজই গেরুয়া এনে দিই তোর জন্য। তৃষ্ণা এবার চোখ জড়ানো গলায় বললো- 'নাহঃ তাড়াহুড়ো নয়। একটু ভাবতে দে আগে। একটু ঘুমিয়ে নিই। তারপর বলবো।' চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলো তৃষ্ণা। কিন্তু মিনিট খানেক পর আবার চোখ খুললো ও। ওর মাকে জিজ্ঞেস করলো- 'সন্ধ্যেবেলা কি বেড়াতে যাবো আমরা, মা? ' তৃষ্ণাকে আরও একবার জড়িয়ে ধরলেন উনি। বললেন- 'গেলেই হয়। নে, এখন একটু রেস্ট করে নে।' © অরুণ মাজী

Bu şiire çeviri ekle ·

Bu şiiri puanla

Henüz puan verilmemiş

Yıldıza dokunarak 1–10 arası puan ver

Yorumlar

Yorum yapmak için giriş yapmalısın.

Giriş yap

Bu şiire henüz yorum yapılmamış. İlk sen ol.

Sana daha iyi bir okuma deneyimi sunabilmek için sitemizde çerez kullanıyoruz. Kişisel verilerin KVKK ve GDPR kapsamında işlenir; hangi çerezlere izin verdiğini dilediğin zaman değiştirebilirsin.